ক্রোয়েশিয়ার রাখাল বালক লুকা মদ্রিচ

 


চ্যাম্পিয়নস লীগের কোয়ার্টার ফাইনাল,  ঘরের মাঠে পিএসজির সাথে ২ গোলে পিছিয়ে ছিলো রিয়াল মাদ্রিদ। ৬০ মিনিটে বেঞ্জেমার গোলে কিছুটা স্বস্তিতে ফেরা মাদ্রিদ শিবিরের। তবে অস্বস্তি ছিলো সমতায় ফেরা নিয়ে। পিএসজি তখনো আক্রমন করে যাচ্ছে,  খেলায় ফের এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ঘড়ির কাঁটা একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ম্যাচকে। ৭৬ তম মিনিটে পিএসজির আক্রমনের প্রতি আক্রমণে বল পেলেন ক্রোয়াট ম্যাজিশিয়ান লুকা মদ্রিচ,  অনেক পথটা এগিয়ে ডিফেন্স চেরা দুদার্ন্ত এক পাস দিলেন ব্রাজিলিয়ান ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে। তবে সেই বলের পুরো ফায়দা তিনি তুলতে পারলেন না, তাকে কাভার করতে দুইজন ডিফেন্ডার সেখানে উপস্থিত। বাধ্য হয়ে বল বাড়াতে চাইলেন বেঞ্জেমার উদ্দেশ্যে, প্রতিপক্ষের হালকা টাচে বল পেয়ে গেলেন আবারো মদ্রিচ। ডানদিকে হালকা সড়ে গিয়ে সামনে চারজনকে খেলোয়াড়কে তার ভোজবাজি দেখালেন, তাদের ফাঁক গলে বল বেড়িয়ে গিয়ে পড়লো বেঞ্জেমার পায়ে। সেখান থেকে জালে। সমতায় ফিরলো রিয়াল মাদ্রিদ। মদ্রিচের সেই পাস তার জাদুকরী পায়ের এক অনবদ্য কাজ...জীবনে এমন পাস দিয়েছেন যে কতবার তার ইয়াত্তা নেই। 


চেলসির সাথে তার বিখ্যাত সেই ট্রিভেলা পাস। ছবিঃ টুইটার



মদ্রিচের জন্ম ক্রোয়েশিয়ার জাদার শহরের অদূরে ভেলেবিট পবর্তমালার মদ্রিচি গ্রামে। দাদা লুকার সাথে সেখানেই থাকতো তার বাবা। এ গ্রামের লোকেরা জন্ম জন্মান্তর ধরে ভেড়া পালতো, এর ব্যতিক্রম মদ্রিচেরা ছিলো না। লুকা মদ্রিচ ছোটবেলায় রাখালের কাজই করতো,  ভেড়া চড়ানো ছিলো তার নিত্যদিনের কাজ। একটা সময় পর ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়। একদিন মদ্রিচের দাদা লুকা ভেড়া চড়াতে গিয়ে আর ফিরে এলেন না। পরিবার জানতে পারে তাকে খুন করেছে সার্বিয়ান গেরিলারা। লুকা মদ্রিচ এখনো জানে না তার দাদাকে কেনো খুন করেছিলো তারা!  এরপর সেখান থেকে পুরো পরিবার আশ্রয় নিলো রিফিউজি ক্যাম্পে,  সেখানে জীবনের ৭ বছর কেটেছিলো লুকার। সেখানেই মাত্র ৬ বছর বয়সে ফুটবলের শুরু। ক্যাম্পের ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ফুটবল খেলতেন নিয়মিত। কখনো কখনো খেলার মাঝে রেড সাইরেন বেজে উঠতো, খেলা রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে হতো তাদের।

জীবনে সবর্স হারাতে বসেছিলেন, নতুন জীবনে এমন কিছু পেয়েছেন তার আর হারানোর কিছু নেই।


মদ্রিচের ফুটবল জীবন বদলে গিয়েছিলো সেখানেই, বাসিচ নামক এক ফুটবল কোচ লুকাকে বদলে দিয়েছিলো। বাসিচ তাকে নিয়ে কাজ করতো খুব, পরিশ্রম করাতো অনেক। মদ্রিচের সেসময় রাগ হতো তার উপর। একদিন কাউকে না জানিয়ে হাইদুক স্পিটের একাডেমিতে ট্রায়াল দিতে চলে যান। তারা মদ্রিচকে রিজেক্ট করে দেয় খাটো আর লিকলিকে রোগা পাতলা বলে। ফিরে এসে দেখেন, বাসিচ তাকে আর ট্রেনিং এ ডাকছে না। দুই সপ্তাহ পর যখন তার মন নরম হলো তিনি ডেকে মদ্রিচকে বলেছিলেন, স্পিট নয় ডাইনামো জাগরেবে খেলবে তুমি। স্পিটের পুরোপুরি রাইভাল ছিলো তারা। মদ্রিচ ঘুণাক্ষরেও তার প্রিয় ক্লাবের রাইভাল ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার কথা ভাবতে পারে নি সেদিন। যদিও পরবর্তীতে জাগরেবেও তার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিলো। মদ্রিচ সারাজীবন তার প্রিয় ক্লাবগুলোর রাইভালদের হয়ে খেলেছেন। ইংল্যান্ডে তার পছন্দ ছিলো চেলসিকে কিন্তু খেলেছেন লন্ডনের আরেক ক্লাব টটেনহ্যামে। ভালোবাসতেন বার্সালোনাকে, জীবনের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে।


মদ্রিচের জীবন আর ১০ টা ফুটবলারের মতো স্বাভাবিকভাবে শুরু হয় নি। ভেড়া চড়িয়ে, শরণার্থী শিবিরে পালিয়ে পালিয়ে থেকে অল্প অল্প করে ফুটবল শিখে নিজেকে বিশ্বসেরাদের কাতারে নিয়ে গেছেন।


মদ্রিচের জীবনের ঘটনাগুলো একটু এদিক সেদিক হলে পাল্টে যেতে পারতো তার পুরো ক্যারিয়ার। তার দাদার মতো সে মারা যেতে পারতো ভেড়া চড়াতে গিয়ে, তার দাদা না মারা গেলে যুদ্ধ না বাঁধলে হয়তো এখনো মদ্রিচি গ্রামে ভেড়া চড়াতেন তিনি। স্পিটের কাছে রিজেক্ট খেয়ে যদি ফুটবল ছেড়ে দিতেন তাহলে কি এই লুকাকে পেতো বিশ্ব?


মদ্রিচ বুড়ো বয়সেও দেখাচ্ছেন ভেলকি।



মদ্রিচ রিফিউজি ক্যাম্প থেকে ফুটবল শুরু করে ৫ বার চ্যাম্পিয়নস লীগ জিতেছেন, ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে গেছেন, গোল্ডেন বল জিতেছেন। জিতেছেন বিশ্বসেরা ফুটবলারের পুরষ্কার- ব্যালন ডি'অর।


মদ্রিচের জীবনে অপূর্ণতা বলে কিছু নেই। কিন্তু এতে তার আত্মা তৃপ্ত না। তাই প্রতিনিয়ত ছুটে চলেন জয়ের আশায়। হার সহ্য করতে পারেন না। 


মদ্রিচ একজন শিল্পী,  বয়স আর অভিজ্ঞতার মিশিলে ফুটবল মাঠে এমন সব চিত্রকর্ম আঁকেন যা দেখে অবাক বিস্ময়মাখা চোখে তাকিয়ে রয় সবাই। মুগ্ধতা আঘাত হানে প্রত্যেক ফুটবল প্রেমীর হৃদয়ে। তার প্রতিটি পাস, প্রতিটি টাচ এক একটা ম্যাজিক। যেগুলো তার বুড়ো বয়সেও রেখে যায় তারুণ্যের ছাপ।

আজ মদ্রিচের ৩৭ তম জন্মদিন। জাদুকরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ